চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহ দিবসে বাসদের শ্রদ্ধাঞ্জলি

433
চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহ দিবসে বাসদের শ্রদ্ধাঞ্জলি
চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহ দিবসে বাসদের শ্রদ্ধাঞ্জলি

১৮ই এপ্রিল চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহ দিবস। বাসদ চট্টগ্রাম জেলার পক্ষ থেকে করোনা ভাইরাস প্রাদুর্ভাবে জনসমাগম এড়িয়ে ও সীমিত সংখ্যক নেতাকর্মী নিয়ে অনাড়ম্বর আয়োজনে ৯০ তম চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহ দিবসে চট্টগ্রাম জেএমসেন হলে মাস্টারদা সূর্যসেনের আবক্ষ ভাষ্কর্যে শ্রদ্ধাঞ্জলী অর্পন করা হয় । ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের সময় মাষ্টার দা সূর্য সেনের নেতৃত্বে চারদিন চট্টগ্রামকে স্বাধীন করে রাখেন এবং স্বাধীনতার জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন বিপ্লবীরা৷ চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহে ইতিহাস নিয়ে নিয়ে আলোচনা করেছেন বাসদ চট্টগ্রাম জেলা শাখার সমন্বয়কসমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের কেন্দ্রীয় সভাপতি আল কাদেরী জয়।

আল কাদেরী জয় বলেন, প্রতিটা দিনের মতনই দিনটা শুরু হলো। করোনার আতঙ্কে বিপর্যস্ত জনগণ,নিস্তেজ কোলাহল আর অবরুদ্ধ পরিবেশ। তবু দিনটা কিছুটা আলাদাই, কারণ আজ ১৮ এপ্রিল; চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহ দিবস। ৯০ বছর আগে এমনই এক দিনে চট্টগ্রাম শহর জেগে উঠেছিলো বৃটিশ রাজশক্তির বিরুদ্ধে। অবরুদ্ধ সেই সময় মুক্তির আহবান করেছিলেন বিদ্রোহের মহানায়ক মাস্টারদা সূর্যসেন। তাঁর সেই ডাকে স্কুল -কলেজের পাঠ ফেলে স্বদেশজননীর চোখের জল মুছতে বৈপ্লবিক সংগ্রামে যুক্ত হন লোকনাথ বল, গণেশ ঘোষ,অম্বিকা চক্রবর্তী,প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, কল্পনা দত্তসহ আরো অসংখ্য অগ্নিযুগের বিপ্লবীরা।
যে সময় প্রচলিত কথাই ছিলো- ইংরেজ সাম্রাজ্যের সূর্য অস্ত যায় না। চট্টগ্রামের এই বিদ্রোহ যুগযুগ ধরে বয়ে চলার সেই চিন্তাকে দেয় এক বিশাল ধাক্কা। এই লড়াইয়ের নেতা মাস্টারদা ছিলেন একজন সাদামাটা স্কুল শিক্ষক।দেখতে শুনতেও ছিলেন না তেমন আকর্ষনীয়,দশাসই কিংবা নায়কোচিত কোনো দেহাবয়ব।খুব বড় পন্ডিতমন্য লোক ছিলেন তাও বলা যাবে না।তবে তাঁর জীবনলব্ধ সংগ্রাম ও চরিত্র থেকে এটা বুঝেছিলেন যে, দেশের মুক্তি না আসলে কখনো ব্যক্তি মানুষেরও মুক্তি ও বিকাশ সম্ভব হবে না।আর তার সেই শিক্ষাই উজ্জীবিত করে তাঁর সকল সহযোদ্ধা ছাত্র-তরুণদের।তাদের কাছে সূর্যসেন হয়ে উঠেন “মাস্টারদা”!

১৯৩০ সালের এইদিনে রাত ১০ টায় সূর্যসেনসহ ৬৫ জনের বিপ্লবী দল ৫টি দলে ভাগ হয়ে চট্টগ্রামের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে আক্রমণ করেন। নির্মল সেন ও লোকনাথ বলের নেতৃত্বে দামপাড়া পুলিশ রিজার্ভ ব্যারাক, গণেশ ঘোষ ও অনন্ত সিং এর নেতৃত্বে পাহাড়তলীতে চট্টগ্রাম রেলওয়ে পুলিশ অস্ত্রাগার, আম্বিকা চক্রবর্তীর নেতৃত্বে চট্টগ্রামের নন্দনকাননে টেলিফোন ও টেলিগ্রাফ ভবন দখল, নরেশ রায় এর নেতৃত্বে ইউরোপীয় ক্লাব আক্রমণ এবং উপেন্দ্রকুমার ভট্টাচার্য ও লালমোহন সেন এর নেতৃত্বে রেললাইন উপড়ে ফেলার মাধ্যমে চট্টগ্রামের সাথে অন্যান্য অঞ্চলের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার দায়িত্ব নেন।
সবকিছু পরিকল্পনামতো হলেও পুলিশ রিজার্ভ ব্যারাকে গোলাবারুদ পাওয়া না যাওয়াতে এবং গুডফ্রাইডে উপলক্ষে ইউরোপিয়ান ক্লাবে কোনো পদস্থ ইংরেজ কর্মকর্তা না থাকায় এ দুটি ক্ষেত্রে আশানুরুপ ফল আসেনি। তবে পাহাড়তলি অস্ত্রাগার লুন্ঠনের পর অস্ত্র ও গোলাবারুদ সংগ্রহ করা হয়।
সর্বশেষ পরিকল্পনা অনুযায়ী দামপাড়া পুলিশ রিজার্ভ ব্যারাক দখল নেয়ার পরে বিপ্লবীরা সেখানে সমবেত হয়ে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। মিলিটারি কায়দায় কুচকাওয়াজ করে সূর্য সেনকে অভিবাদন জানান তাঁরা। সেখানেই সূর্যসেন অস্থায়ী বিপ্লবী সরকার গঠনের ঘোষণা দেন।
এই স্বাধীনতার ৪ দিনের সময়, ২২ এপ্রিল বিপ্লবীরা যখন জালালাবাদ পাহাড়ে অবস্থান করছিলেন তখন সশস্ত্র ইংরেজ সৈন্যরা তাঁদের ওপর আক্রমণ করে।এই যুদ্ধে ব্রিটিশদের ৭০ হতে ১০০ জন সৈন্য মারা যায় এবং ১২ জন বিপ্লবী শহীদ হন।
আজ ইংরেজ শাসন নেই, নেই পাকিস্তানি শাসকদের দমন-পীড়ন। কিন্তু বৈষম্যের সমাজে দেশীয় শাসকগোষ্ঠীর লুটপাটে দিশেহারা অধিকারহীন সাধারণ জনগণ। তাদের বেঁচে থাকার উপায় ও মর্যাদার জীবন কতটা অবহেলিত তা বোঝায় যায় করোনার মহামারির এই সময়ে।দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জন্য নেই পর্যাপ্ত হাসপাতাল ও চিকিৎসা সুবিধা।এমনকি চিকিৎসকদেরও নেই উপযুক্ত নিরাপত্তা ও চাকরির নিশ্চয়তা।সরকারের দায়িত্বশীল প্রধানমন্ত্রী,স্বাস্থ্য,সেতু,তথ্যসহ বিভিন্ন মন্ত্রীদের হাঁকডাক কিংবা রাগ যতটা দেখা গেছে করোনা প্রতিরোধে তাদের করণীয় দিক মানুষ ততটা দেখতে বা উপলব্ধি করতে পারে নি। লকডাউনে অসহায় ৬ কোটি ৩৫ লক্ষ শ্রমজীবী মানুষের জীবিকা। ঘরের মধ্যে লোকজনকে জোর করে হয়তো কোয়ারাইন্টাইনে ঢুকিয়ে দেয়া যায় কিন্তু তাদের ক্ষুধা? তাকে তো আর আইসোলেশনে রাখা যায় না!
অথচ এরমধ্যেই চলছে সরকারি দলের নেতাকর্মী, ইউনিয়ন চেয়ারম্যান, মেম্বারদের ত্রাণের চাল,তেল লুটের মহোৎসব। এরই নাম পুঁজিবাদ! এরই নাম মুনাফা! সে আছে মানেই ধসিয়ে দিবে সকল মানবিকতা ও মূল্যবোধের দায়! উন্নয়নের নামে আজ মেট্রোরেল, পদ্মাসেতু,চার লেইন সড়ক থেকে স্যাটেলাইট সবই হচ্ছে এই মুনাফা লোটার কন্ট্রাক্টরি মাত্র!
একদিন এইদেশে ইংরেজরা যেমন গরীব তাঁতীদের আঙুল কেটে বিদেশে জমিয়েছে নীলচাষের ফসল তেমনি আজ এইদেশের লুটেরা ধনিকগোষ্ঠী দেশের জনগণের টাকা মেরে বিদেশে বানাচ্ছে সেকেন্ড হোম-বেগম পল্লী! এই শোষন-জুলুমের পোশাক আলাদা কিন্তু শরীর একই!

তাই এই লুটপাট,দুঃশাসন ও স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে মাস্টারদা সূর্যসেনের লড়াই আজো এইদেশের প্রতিবাদী তরুণ-যুবকদের সাহসের প্রেরণা। অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে চরিত্র নিয়ে বাঁচার মন্ত্র!
দিন শেষে সূূর্য অস্ত যায়,কিন্তু মাস্টারদা সূর্যসেন কখনো অস্তমিত হয় না!
আগামীদিনে সবাইকে সেই লড়াইয়ে আহবান জানাই-
মাস্টারদা সূর্যসেন – লাল সালাম!
চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহ – লাল সালাম!