আপনার শিশুর প্রতি ন্যায়বিচার করুন

50
আপনার সন্তানের প্রতি ন্যায়বিচার করুন
আপনার সন্তানের প্রতি ন্যায়বিচার করুন

আসিফ সিবগাত ভূঁইয়া

আপনি যদি নিজের ছোটবেলা ঘেঁটে দেখেন তাহলে একটা ব্যাপার খেয়াল করবেন। ছোট শিশুরা যদি বড়দের কাছে প্রচণ্ড বকুনি বা মারও খায় তবে সেটাতে তাৎক্ষণিকভাবে মন খারাপ করলেও পরবর্তীতে ভুলে যাবে। যেটা সে মনে রাখবে সেটা হলো এই গালমন্দ! যদি সে অন্যায় কারণে পেয়ে থাকে। শিশুরা ছোটবেলা থেকেই সুবিচার ও অবিচারের পার্থক্য করতে পারে। তাই যদি আপনি তাকে অন্যায়ভাবে শাস্তি দিয়ে থাকেন অথবা যা করেছে তার চেয়ে বেশি দিয়ে থাকেন – আপনি নিজে পরবর্তীতে আপনার এই অন্যায় ভুলে যেতে পারেন – শিশুটি ফটোগ্রাফিক মেমরি দিয়ে মনে রাখবে।

ধরুন একটা খুবই সামান্য ব্যাপার (আপনার কাছে)। আপনি শিশুকে বললেন যে, সে হোমওয়ার্ক শেষ করলে তাকে আপনি পছন্দের কোনও জায়গায় ঘুরতে নিয়ে যাবেন। কিন্তু শিশু হোমওয়ার্ক শেষ করতে করতে আপনার আর যেতে ইচ্ছা করছে না। আপনি স্রেফ বলে দিলেন যে, আজ আর যাবেন না এবং কোনও গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যাও দিলেন না। আজ থেকে ত্রিশ বছর পর আপনার সন্তান এই ঘটনা আপনাকে পুঙ্খানুপুঙ্খ বলে দিতে পারবে।

শিশুর সাথে ষোল আনা সৎ ও ন্যায় আচরণ করুন। স্কুলে সারাদিন ক্লাস করে আসা শিশুটিকে যদি সন্ধ্যায় হোমওয়ার্ক করতে বা পড়তে বসাতেই হয় তাহলেও আপনিও তার সাথে ঐ ধরণের কষ্টকর কোন কাজ করুন – ভালো হয় যদি তার সাথে হোমওয়ার্ক শেষ করাতে অংশগ্রহণ করতে পারেন। নিদেনপক্ষে ঐ সময়টায় টিভি দেখবেন না বা মোবাইলে ব্রাউজিং করবেন না।

আরেকটি কাজ যেটা একটি শিশুকে পুরোপুরি ভেঙে দেয়ার জন্য যথেষ্ট, সেটি হলো সন্তানদের মাঝে বৈষম্য করা। বাবা মায়ের অনেক সময়ই একটি দুটি সন্তান থাকে যাকে তার বেশি মনে ধরে। সব সন্তানই বাবা মার কাছে সমান হয় এমন না। সস্তা আবেগের বশবর্তী না হয়ে এই সত্যের মুখোমুখি হওয়াই ভালো। কোন সন্তানের প্রতি যদি আপনার স্বাভাবিক একটু বেশি ভালোলাগা থাকেই এতে আপনার দোষ নেই। নিজের স্বাভাবিক অনুভূতিকে আপনি দমন করতে পারবেন না। কিন্তু যেটা আপনি অবশ্যই কন্ট্রোল করতে পারেন এবং বাবা মা হিসেবে এটা আপনার দায়িত্ব – সেটি হলো সন্তানদের সেটা বুঝতে না দেয়ার জন্য প্রাণপন চেষ্টা করা।

সন্তানকে উপহার ও বকা – দুটিই দেয়ার ক্ষেত্রে ইনসাফ করুন। একই গুণে উপহার দেয়ার ক্ষেত্রে কমবেশি করা বা একই দোষে শাস্তি দেয়ার ক্ষেত্রে কম বেশি করা – এই অবিচার সন্তান বুঝতে পারে। এবং এটি যখন বাবা মা করেন – তখন তারা ঠিকই সেটা ধরতে পারে। এটা আপনার না বোঝার কোনও কারণ নেই যে মানুষ সেলফ রেফারেনশিয়াল প্রাণি নয় – সে আদার রেফারেনশিয়াল প্রাণি। সে নিজে কতটা ভালো আছে সেটা সে অন্যরা কেমন আছে কী পাচ্ছে তা দিয়ে জাজ করে। আপনার সন্তান এটা চিন্তা করবে না যে টফি তো সে পেয়েছে, সে এটা অবশ্যই ভাববে যে তার ভাই বা বোন কেন দুটি টফি পেলো।

শিশুকে বোকা ভাববেন না এবং নিজের দোষ শিশুর ওপর চাপাবেন না। কখনও কখনও যে আপনার এক শিশু আরেক শিশুর চেয়ে বেশি পেতে পারে সেই কন্টেক্সট আপনার শিশু বোঝে, ও অত শিশু না। সুতরাং ঐ ফালতু আলাপে যাওয়ারই প্রয়োজন নেই। কখন আপনি উচিৎ কারণে বেশি কম করছেন আর কখন আপনি বৈষম্য করছেন – এই পার্থক্য শিশু ধরতে পারে – অন্তত প্রথম বার না বুঝলেও বুঝিয়ে দিলে বুঝতে পারে। যেটা করে আপনি কখনই তার চোখে পার পাবেন না সেটা হলো আপনার নিজের প্রেজুডিস বা স্বজনপ্রীতি।

এসব ভুলের খুব বড় মাশুল আপনাকে ভবিষ্যতে গুনতে হতে পারে। আপনি যেমন তার সাথে অভিনয় করে গেছেন, সৎ থাকেননি – বড় হয়ে সেও আপনার সাথে খুব বেশি হলে ভালোবাসার শুষ্ক অভিনয় করে যাবে – যদি সরাসরি খারাপ ব্যবহার নাও করে। আপনি নেহাত মূর্খ বলেই সন্তানের ছোটবেলায় ভেবেছিলেন আপনাদের এধরণের আচরণগত অসঙ্গতি সে ধরতে পারেনি। সেই একই মূর্খতার কারণে আজ তার অভিনয় আপনি ধরতে পারছেন না।

নিজেকে অন্যরকম ভাববেন না। নিজে থেকেই মনে করবেন না যে আপনি বাবা মা হিসেবে খুব ভালো। বিনয়ী হন। দরকার হলে শিশুর মনস্তত্ব নিয়ে বোঝার চেষ্টা করুন। শিশুর সাথে আপনার কর্তৃত্বের সম্পর্ক বজায় রেখেই তাকে মাঝে মাঝে জিজ্ঞেস করুন যে আপনার পূর্বের কোনও আচরণে সে কষ্ট পেয়েছে কিনা। যদি ভ্যালিড কোনও কারণে পেয়ে থাকে তাকে সরি বলুন, সরি বলাতে আপনার কর্তৃত্ব কমে যাবে না, বরং বেড়ে যাবে। যদি তার কষ্ট পাওয়াটা ভুল কারণে হয়ে থাকে তাকে ভালো করে বোঝান, বাবা মা হিসেবে আপনারও সীমাবদ্ধতাগুলো তার সামনে তুলে ধরুন, সে এগুলো সবই অ্যাপ্রিশিয়েট করবে।

আগেকার দিনে শিশুর সাথে অন্তরঙ্গ মুহুর্তগুলো অ্যালবামে ধরে রাখা হতো। আজকাল আপনি সেগুলো ফেইসবুকে শেয়ার করবেন, শিশুদের আদুরে কথাগুলো স্ট্যাটাস হিসেবে শেয়ার করবেন, বাচ্চার ভিডিও বানাবেন। এতে পুরো দুনিয়া মনে করবে প্যারেন্ট হিসেবে আপনি খুব আদর্শবান। প্যারেন্ট হিসেবে আপনি আদর্শবান কিনা এটা তো সারা দুনিয়াকে আর নিজেকে বুঝিয়ে লাভ নেই, আপনি তো আর সারা দুনিয়ার প্যারেন্ট না। আপনি যার প্যারেন্ট সে আপনার প্যারেন্টাল গ্রেটনেসকে কীভাবে দেখে সেটা হলো বড় কথা।

শিশু আপনাকে যদি “আই লাভ য়ু” বলে তাতেও কিন্তু প্রমাণ হয়না যে আপনি খুব ভালো প্যারেন্ট। এসব বাহ্যিক টোকেন কথা শিশুরা আপনার ওপর নির্ভরশীল বলেই বলতে পারে। অথবা ছোটবেলায় সে নিজেও কনফিউজড থাকে বলে তার মনের সন্দেহগুলোকে দূরে সরিয়ে রেখে আপনাকে ভালোবাসতে চাইতে পারে। এখানেই বিপদটা। কেননা তার বাহ্যিক আচরণ থেকেও যেহেতু তার মনের কষ্টগুলো বোঝা যাচ্ছে না, আর যেহেতু আপনি নিজের মাতৃত্ব ও পিতৃত্বের গর্বে সোশাল মিডিয়া পোস্ট দিয়েই এত আত্মতুষ্ট যে ভেতরের এই ক্ষয়গুলো আপনার চোখে পড়বে না।

এখনই সাবধান হোন। এই লেখায় আপনাকে শিশুর দাসত্ব করতে বলা হয়নি। শুধু তার সাথে ইনসাফ করতে বলা হয়েছে আপনাকে। আপনি আপনার সন্তানকে অবশ্যই শাসন করবেন – কিন্তু সেখানেও ইনসাফ বজায় রাখুন। সন্তান যদি তার বাবা মার কাছে ইনসাফ না পায়, পুরো পৃথিবীর কোথায় সে ইনসাফ খুঁজবে বলুন?