করোনা ভাইরাস ॥ ৮ কারণে লাফিয়ে বাড়ছে সংক্রমণ

442
করোনা ভাইরাস
করোনা ভাইরাস

ক্লাস্টার (একই এলাকায় কম দূরত্বে একাধিক আক্রান্ত) নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা, পিসিআর (পলিমারেজ চেইন রিঅ্যাকশন) মেশিন সংকটের কারণে প্রয়োজন অনুযায়ী রোগী শনাক্তকরণ পরীক্ষার (টেস্ট) পরিধি বাড়াতে না পারা এবং অঘোষিত লকডাউনের মাধ্যমে সারাদেশে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিতকরণে নানা প্রতিবন্ধকতাসহ ৮ কারণে দেশে মরণঘাতী এ ভাইরাসের সংক্রমণ গত দুই সপ্তাহ ধরে উচ্চহারে বাড়ছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের আশঙ্কা, এসব সংকট দ্রুত কাটিয়ে উঠতে না পারলে যুক্তরাষ্ট্র, স্পেন, ইতালি ও যুক্তরাজ্যের মতো বাংলাদেশেও করোনার প্রকোপ ভয়াবহ রূপ নেবে। যা দেশের নাজুক স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় সামাল দেওয়া একেবারেই অসম্ভব। তাই এ পরিস্থিতি সৃষ্টির আগেই যে কোনোভাবে এর লাগাম টেনে ধরা জরুরি বলে সতর্ক করেন বিশেষজ্ঞরা। স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা জানান, লকডাউন ও ক্লাস্টার নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা এবং টেস্টের পরিধি বাড়াতে না পারার বাইরে আরও যে ৫টি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে সেগুলো হচ্ছে- চিকিৎসক-নার্সসহ স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টদের পার্সোনাল প্রটেকশন ইক্যুইপমেন্ট (পিপিই) সংকট এবং এর মান নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা না থাকা, রোগীর তথ্য গোপনের প্রবণতা, করোনার ভয়াবহতা সম্পর্কে অজ্ঞতা ও অসচেতনতার কারণে দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর এ সংশ্লিষ্ট সতর্কতা মেনে চলার ক্ষেত্রে অনীহা, করোনায় আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসা নিয়ে ভোগান্তি এবং সর্বোপরি জীবন ধারণের জন্য ন্যূনতম খাদ্য যোগানের অনিশ্চয়তা। গুরুত্বপূর্ণ এ ৮টি সংকটের সাময়িক ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান ছাড়া করোনার সংক্রমণের লাফিয়ে বাড়া ঠেকানো দুষ্কর হবে বলে মন্তব্য করেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। দেশের করোনা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণকারী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা জানান, করোনার হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জসহ দেশের অন্তত চারটি ক্লাস্টার এলাকা নিয়ন্ত্রণে এপ্রিলের মাঝামাঝি সময় থেকে নানামুখী পদক্ষেপ নেওয়া হলেও সামান্য অংশও বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। এমনকি ক্লাস্টার এলাকা থেকে যাতে কেউ পালিয়ে ভিন্ন এলাকায় যেতে না পারে এজন্য র‌্যাব-পুলিশের অতিরিক্ত ফোর্স মোতায়েন, প্রয়োজনে সেনাবাহিনীকে মাঠে নামানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও এসব পরিকল্পনার ছক নথিতেই গন্ডিবদ্ধ হয়ে রয়েছে। অথচ ক্লাস্টার এলাকা নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস ভয়াবহ আকারে ছড়িয়ে পড়বে বলে স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা সরকারকে বারবার সতর্ক করেছে। দ্রুত এ উদ্যোগ না নেওয়া হলে করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে বলেও হুঁশিয়ার করা হয়েছে।

আইইডিসিআরের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, ক্লাস্টার নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার কারণেই মূলত গত কয়েকদিনে করোনা সংক্রমণ উচ্চহারে বাড়ছে। এখন পর্যন্ত দেশের যে ৫৭টি জেলায় করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঘটেছে এর মধ্যে টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ, হবিগঞ্জ, লালমনিরহাট, দিনাজপুর, চাঁদপুর, পিরোজপুর, ফরিদপুর, পাবনা, নরসিংদী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, বান্দরবান, রংপুর, ঠাকুরগাঁও, নড়াইল, পটুয়াখালী, ঝালকাঠি, নওগাঁ, রাজশাহী, জয়পুরহাট ও গাজীপুরসহ অন্তত ২৬টিতে সংক্রমণ হয়েছে নারায়ণগঞ্জ থেকে যাওয়া লোকজনের মাধ্যমে। এছাড়া ঢাকা ও গাজীপুর ক্লাস্টার থেকে যাওয়া করোনায় আক্রান্তরা পঞ্চগড়, জামালপুর, লক্ষীপুর, কুড়িগ্রাম ও ফেনীসহ আরও অন্তত ১২ জেলায় এ রোগ ছড়িয়েছে। ক্লাস্টার নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার বিষয়টি খোদ স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকও নিঃসংকোচে স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ থেকে সারাদেশে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ছে। লকডাউন কাজ করছে না সেভাবে। আর লোকজন আক্রান্ত এলাকা থেকে ভালো এলাকায় যাচ্ছে। এতে নতুন লোক আক্রান্ত হচ্ছে। এদিকে, বেশ আগে থেকেই লকডাউন ঘোষণা করেও করোনার হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত নারায়ণগঞ্জের ক্লাস্টার নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পারার ব্যাপারে বিভিন্নজন ভিন্ন কারণ জানালেও সেখানকার বাসিন্দারা এ জন্য স্থানীয় প্রশাসনের দুর্বলতা ও অব্যবস্থাপনাকেই দায়ী করেছেন। তাদের ভাষ্য, নারায়ণগঞ্জের বাসিন্দাদের একটি বড় অংশ বাইরের এলাকার নিম্নবিত্ত পেশাজীবী মানুষ। গার্মেন্টসহ বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থানের কারণে তারা সেখানে অবস্থান করতো। করোনার ভয়াবহতার কারণে আকস্মিক এসব কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তারা কর্মহীন হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় সঞ্চয়হীন মানুষের পক্ষে দু’বেলা খেয়েপড়ে সেখানে অবস্থান করা দুষ্কর হয়ে দাঁড়ায়। যে কারণে তাদের অনেকে রাতের আঁধারে পালিয়ে নিজ নিজ গ্রামে ফিরে গেছে। এছাড়া মারাত্মকভাবে সেখানে করোনা ছড়িয়ে পড়ায় অনেকে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে এলাকা ছেড়েছে। তবে সময়মতো এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় কঠোর উদ্যোগ নেওয়া হলে নারায়ণগঞ্জের ক্লাস্টার নিয়ন্ত্রণ খুব বেশি দুরূহ হতো না বলে দাবি করেন স্থানীয়রা।

এদিকে, করোনাভাইরাসে মহামারির প্রকোপ নিয়ন্ত্রণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা সন্দেহভাজন রোগীদের পরীক্ষা বাড়ানোর ব্যাপারে বারবার তাগিদ দিলেও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা সরঞ্জাম ও দক্ষ জনবল সংকটের কারণে দেশে তা সম্ভব হয়নি। ফলে করোনায় আক্রান্ত অনেকে নির্বিঘেœ ঘুরে বেড়িয়ে একাধিক সুস্থ মানুষের মাঝে এ ভাইরাস ছড়িয়েছে। ডব্লিউএইচও’র মতে, করোনাভাইরাস মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হতে পারে সংক্রমিত রোগী শনাক্ত করে দ্রুত তাদের আইসোলেট করা। অথচ চট্টগ্রাম বিভাগের ১০ জেলার তিন কোটি মানুষের করোনার নমুনা পরীক্ষার জন্য পিসিআর আছে মাত্র দুটি। ঢাকায় রয়েছে মাত্র ১০টি। সব মিলিয়ে দেশে মাত্র ২১টি ল্যাবে পরীক্ষা চলছে। এতে এক একটি কেন্দ্রে সকাল থেকে বিকাল অবধি বিপুলসংখ্যক মানুষকে লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। ফলে অনেক সময় রোগাক্রান্তদের থেকে সুস্থ মানুষও সংক্রমিত হচ্ছে। পরিসংখ্যান নিয়ে কাজ করা ওয়েবসাইট ওয়ার্ল্ডোমিটারসের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত মাত্র .০৯৮ শতাংশ মানুষের করোনা টেস্ট করা হয়েছে। অথচ সার্কভুক্ত দুটি দেশে এর হার ৫০ থেকে ৫৫ গুণ বেশি। প্রতিবেশী দেশ ভারতেও করোনা পরীক্ষার হার বাংলাদেশের প্রায় দ্বিগুণ। করোনাভাইরাসে আক্রান্তের দিক থেকে শীর্ষ দেশগুলোর প্রবণতা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সব দেশেই এক থেকে দেড় মাস পরে রোগীর সংখ্যায় বড় ধরনের উত্থান ঘটেছে। দেশগুলো ব্যাপকভিত্তিক পরীক্ষা করে রোগী শনাক্ত করছে। অথচ বাংলাদেশ এখনো এ ক্ষেত্রে যথেষ্ট পিছিয়ে রয়েছে। যা করোনা সংক্রমণ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন। বাংলাদেশে করোনা পরিস্থিতি পর্যালোচনায় সম্প্রতি জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে অস্বাভাবিক মাত্রার জনঘনত্ব বিবেচনা করে বৈশ্বিকভাবে স্বীকৃত পন্থা অবলম্বন করে ধারণা করা যায়, এখনই প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ নেওয়া না হলে মহামারির প্রভাবে ব্যাপকসংখ্যক মানুষের মৃত্যু ঘটতে পারে। জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের দুর্বল স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করে বলা হয়েছে, এখানে রোগীদের চিকিৎসা দেওয়ার ব্যবস্থা দুর্বল, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থাই নেই। এসব কারণে মহামারি রোধ করা কঠিন হবে।

কোভিড-১৯ সংক্রমিত হলে অন্যান্য রোগীদের চিকিৎসাও বাধাগ্রস্থ হবে। রোগীর ঘনত্বের তুলনায় দক্ষ স্বাস্থ্যসেবাকর্মীর অভাব বাংলাদেশে প্রবল। এছাড়া সংক্রমণ প্রতিরোধে পর্যাপ্ত অনুশীলন ও দক্ষতার অভাব, ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জামের (পিপিই) অপ্রাচুর্যতা, রোগীর বহুল ঘনত্ব মিলিয়ে করোনা মোকাবিলা করা বাংলাদেশের জন্য বেশ কঠিন হবে বলে সতর্ক করা হয়েছে। জাতিসংঘের প্রতিবেদনে চিকিৎসকদের পিপিই সংকটের কথা তুলে ধরে বলা হয়, করোনার সংক্রমণ রোধ এবং ভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সামনের সারির সৈনিক চিকিৎসকদের স্বাস্থ্যসুরক্ষায় পর্যাপ্ত ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম (পিপিই) সরবরাহ করা জরুরি। করোনা পরিস্থিতি গুরুতর হলে পর্যাপ্ত সংখ্যক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) তৈরি রাখার কথা বলা হয়েছে। এদিকে, স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, শুধু করোনা পরীক্ষার পরিধি বাড়ালেই চলবে না।

সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার জন্য সরকারের নেওয়া পদক্ষেপ সচল রাখতে হবে।

সংক্রমণের হার নির্ধারণের জন্য পর্যাপ্ত পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। বর্তমানে সংক্রমণের হার যথেষ্ট কম আছে, এখনই হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে না পারলে মহামারি আকার ধারণ করবে। অন্যদিকে, করোনায় আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসা ক্ষেত্রে নানা ভোগান্তি এর সংক্রমণ দ্রুতহারে বাড়াচ্ছে বলেও মনে করেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। তারা জানান, চিকিৎসক, নার্সসহ স্বাস্থ্যকর্মীদের ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য সুরক্ষা সরঞ্জামের ঘাটতি কমলেও সেগুলো মানসম্মত নয়। ফলে চিকিৎসা দিতে গিয়ে ঝুঁকিতে পড়তে হচ্ছে। এ কারণে তারাও আন্তরিকভাবে চিকিৎসা সেবা দেওয়ার আগ্রহ হারাচ্ছে। ফলে করোনা রোগীদের চিকিৎসা সেবা পেতে গিয়ে নানা দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। এমনকি করোনা চিকিৎসার জন্য ডেজিগনেটেড হাসপাতালগুলোতেও রোগীদের একই ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এদিকে, দেশের করোনা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণকারীরা বলছেন, বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাসের ভয়াবহ প্রকোপ ও এর পরিণতি প্রতিনিয়ত বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশিত হলেও এ ব্যাপারে জনসচেতনতা ততটা বাড়েনি। তাই করোনা প্রতিরোধ সংক্রান্ত সতর্কতা মেনে চলার ক্ষেত্রে অনেকেই চরম উদাসীন। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি লকডাউনে কর্মহীন হয়ে পড়া বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে নির্বিঘেœ এখানে সেখানে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এদিকে, করোনা সংক্রমণের ঊর্ধ্ব লাফের জন্য রোগীর তথ্য গোপনের বিষয়টিকে বিশেষভাবে চিহ্নিত করা হলেও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এ জন্য স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্বলতাকেই দায়ী করেছেন। তারা বলেন, একজন মানুষ করোনা পজিটিভ হওয়ার কারণে তাকে যে পরিমাণ হয়রানি, হেনস্তা, অমানবিকতা আর স্টিগমার ভেতর দিয়ে যেতে হয়, তাতে করে রোগী তথ্য গোপন করতে বাধ্য হয়। করোনা আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসকের কাছে গেলে চিকিৎসা পাওয়া যাবে, কিন্তু গোপন রাখলে বিপদ বেশি, এটা বোঝাতে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ব্যর্থ হয়েছে। তাই আইন প্রয়োগ করে তা বন্ধ করা যাবে না। এজন্য প্রচুর মোটিভেশনাল ওয়ার্ক করতে হবে।